শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৫৯ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
কিশোরগঞ্জে মাদকবিরোধী অভিযানে ইয়াবাসহ আটক যুবকের জেল-জরিমানা কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মাজহারুল ইসলামের ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে নিয়োগ পেলেন মোশারফ হোসেন কিশোরগঞ্জে কৃষকের জমির ধান কেটে বোরো উৎসবের উদ্বোধন করলেন জেলা প্রশাসক করিমগঞ্জে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলা: নজর কেড়েছে খুদে বিজ্ঞানীদের তাক লাগানো উদ্ভাবন দু:খ নদীটার দিনকাল গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে কিশোরগঞ্জে ১১ দলের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ কিশোরগঞ্জে ১১ দলের সপ্তাহব্যাপী লিফলেট বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন সংবাদ প্রকাশের জেরে মামলা: জামিনে মুক্তি পেলেন সাংবাদিক খায়রুল নম্বরবিহীন মোটরসাইকেলে তেল নিতে গিয়ে ইউএনও’র কাছে ধরা খেলেন কারারক্ষী পাকুন্দিয়ায় ইয়াবা ও দেশীয় অস্ত্রসহ আটক ২

পাটবীজ উৎপাদনে চমক দেখালেন কৃষক আবু হানিফ

  • আপডেট সময় : শুক্রবার, ৬ মার্চ, ২০২৬, ১১:৫৩ পূর্বাহ্ণ

বিশেষ প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার পাশাপাশি দুটি গ্রামের নাম খয়রত ও মদন। একসময় সাধারণ কৃষিপ্রধান গ্রাম হিসেবে পরিচিত হলেও এখন অনেকেই গ্রাম দুটিকে চেনেন ‘পাটবীজের গ্রাম’ হিসেবে।

পাটবীজ উৎপাদনের শুরুটা হয়েছিলো খয়রত গ্রামের আবু হানিফের হাত ধরে। এরপর পাশাপাশি গ্রাম দুটিতে তৈরি হয়েছে শত শত নতুন উদ্যোক্তা। পাটবীজ উৎপাদনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়েছেন এখানকার কৃষকেরা, তৈরি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থান। আগে কাজের খোঁজে বাইরে যেতে হলেও এখন গ্রামেই মিলছে নিয়মিত আয়।

একসময় এই গ্রামে পাট চাষ হলেও মানসম্মত বীজের অভাবে কৃষকেরা কাঙ্ক্ষিত ফলন পেতেন না। রোগবালাই ও কম উৎপাদনে হতাশ ছিলেন অনেকে। এখন সেই চিত্র বদলে গেছে। পাটবীজকে ঘিরে নতুন স্বপ্ন দেখছে পুরো এলাকা। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছেন স্থানীয় উদ্যোক্তা আবু হানিফ।

গবেষণালব্ধ বীজ নিয়ে কাজ শুরু করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগিতায় তিনি গড়ে তুলেছেন সফল বীজ উৎপাদন ব্যবস্থা। তাঁর উৎপাদিত এইচসি-৯৫ জাতের বীজ ব্যবহার করে কৃষকেরা বিঘাপ্রতি পাচ্ছেন প্রায় ১৬ মণ পর্যন্ত পাট। যেখানে প্রচলিত আমদানিকৃত ভারতীয় জাতের বীজে ফলন হয় ১০ থেকে ১২ মণ।

আবু হানিফ জানান, শৈশব থেকেই তিনি পূর্বপুরুষদের কৃষিকাজ দেখে বড় হয়েছেন। তাঁদের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে পাটের আবাদ হতো। কিন্তু রোগবালাই ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সেই পাটের অনেকটাই নষ্ট হয়ে যেত। প্রত্যাশিত ফলনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক উৎপাদন পেতেন তাঁরা।

পড়াশোনা শেষ করে কৃষিকাজেই মনোযোগ দেন আবু হানিফ। পাটের ফলন বাড়ানোর উপায় খুঁজতে তিনি যোগাযোগ করেন পাট গবেষকদের সঙ্গে। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর পাটবীজ উৎপাদনের যাত্রা। প্রথম বছরে উৎপাদিত বীজের অর্ধেক নিজের কাছে রেখে বাকিটা স্থানীয় কৃষকদের কাছে বিক্রি করেন। ভালো ফলন হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে দ্রুত আস্থা তৈরি হয়। পরে অন্য কৃষকেরাও তাঁর বীজ ব্যবহার শুরু করেন।

আবু হানিফ বলেন, “সরকার প্রতিবছর চার হাজার টনের বেশি পাটবীজ আমদানি করে। দেশের বড় একটি অংশ এখনও আমদানিনির্ভর। এইচসি-৯৫ জাতটি যদি সরকারি উদ্যোগে সম্প্রসারণ করা যায়, তাহলে আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং উৎপাদন বাড়বে।”

মদন গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ সুকায়েত বলেন, আগে বীজ আনতে বা বিক্রি করতে দূরে যেতে হতো। এখন পাইকাররা সরাসরি গ্রামে এসে বীজ কিনে নিয়ে যান। তিনি বলেন, “কেনাফ পাটের বীজ চাষ ধানের চেয়ে বেশি লাভজনক। এতে সেচ, সার ও শ্রমিক কম লাগে, বাজারেও ভালো চাহিদা রয়েছে।”

একই গ্রামের কৃষক ওমর সিদ্দিক বলেন, কেনাফ পাটের বীজের বাজারে ভালো চাহিদা থাকায় উৎপাদনের পর বিক্রি নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হয় না। পাশাপাশি পাট চাষে জমির উর্বরতাও বাড়ে, যা পরবর্তী ফসলের জন্য উপকার বয়ে আনে।

তিনি জানান, আবু হানিফের পরামর্শে প্রথমে ৫০ শতাংশ জমিতে পাট আবাদ করেছিলেন। ভালো ফলন ও লাভ দেখে এবার তিনি ছয় একর জমিতে পাট চাষ করেছেন। আবু হানিফের সফলতা দেখে এলাকায় দুই থেকে আড়াইশ নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে বলেও জানান তিনি।

আবু হানিফের খামারে নিয়মিত কাজ করেন মো. রতন মিয়া। তিনি বলেন, “আগে কাজের জন্য দেশের বিভিন্ন এলাকায় যেতে হতো। এখন কেনাফ পাটবীজ চাষের কারণে গ্রামেই কর্মসংস্থান হয়েছে।”

পাশের খয়রত গ্রামের কৃষক শাহ আলম জানান, কেনাফ পাটের নিচের অংশ ভালো জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়, ফলে কৃষকেরা বাড়তি সুবিধাও পান।

বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, কিশোরগঞ্জের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ আশরাফুল আলম বলেন, আবু হানিফের উৎপাদিত বীজের গুণগত মান ভালো। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকেরা তাঁর কাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করছেন। তাঁর মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তাও তৈরি হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কিশোরগঞ্জের উপপরিচালক ড. মো. সাদিকুর রহমান বলেন, “আবু হানিফের গ্রামটিকে এখন অনেকে পাটবীজ গ্রাম হিসেবে চেনে। তাঁর হাত ধরে দুই শতাধিক উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে। কিশোরগঞ্জকে যদি পাটবীজ উৎপাদনের হাব হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে এটি সারাদেশে বিশেষ পরিচিতি পাবে।”

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
© All rights reserved © 2025 kishoreganjnews
Customized By Ayaz Host