মু আ কুদ্দুস, সিডনি, অস্ট্রেলিয়া থেকে: শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) বিকেল দুইটা এক মিনিট, যাচ্ছি সিডনির উলংগং নামের একটি জায়গায়। যেখানে আকাশ আর পাহাড় সঙ্গে নীল সাগরের ঢেউ সাদা ফণা তুলে লাফালাফি করছে। যেখানে পাথরের পাহাড় চিরন্তন জেগে আছে। মানুষের ভালোবাসায় প্রতি মুহুর্তে রূপ বদলায় প্রকৃতি এখানে। নতুন করে জেগে ওঠে রাতের আকাশ। কখনো বৃষ্টি। কখনো কাঁচা সাদা রোদ।
আজ আমার সঙ্গী নানু ভাই আয়জান তাজওয়ার ও আমার মেয়ে জামাই পৃথুল। পথে নানু ভাইয়ের জন্য কিছু খাবার নেয়া প্রয়োজন। তাই পথে যাত্রা বিরতি নিলাম ম্যাকডোনাল্ড শপিং মলে। এই ম্যাকডোনাল্ড সিডনিতে সহস্রাধিক শাখা। শুনলাম কয়েক কোটি টাকার ব্যবসা তাদের একদিনে হয়। বলে রাখি, গাড়ি থেকে অর্ডার দিলেই তারা পৌঁছে দেয় রাস্তায় এসে। ফোনে অর্ডার দেয়া হয়। কয়েক মিনিটের মধ্যে দেখলাম গেটে খাবার পৌঁছে গেছে।
এরপর উলংগং এর দিকে যাত্রা শুরু হলো। সুন্দর রাস্তা। ১৩০ কিলোমিটার পথ যেতে হবে। ১০০ কিলোমিটার বেগে ছুটে চলছে আমাদের গাড়ি। রাস্তা ছ’লেন, কোথাও আট, কোথাও চার লেন।
দীর্ঘ সময় পর পৌঁছালাম বিখ্যাত চলচ্চিত্র “মিশন ইম্পসিবল” শুটিং স্পটে। অপূর্ব দৃশ্য সেখানে। পাহাড়ের পাশ দিয়ে যাচ্ছি। দু’পাশে মনকাড়া সবুজ বৃক্ষ আর নানা ধরনের বাহারি ফুল ভরা গাছ। দীর্ঘ পথটি ছিলো উঁচু নিচু। রাস্তায় জট নেই। তাই আমাদের গাড়ি দ্রুত গতিতে ছুটে চলছে।
চল্লিশ মিনিটের মধ্যে পৌঁছালাম “হীথ কোট” নামক একটি জায়গায়। এখান থেকে ইউ টার্ন নিয়ে চলছি আঁকাবাঁকা পথ ধরে উলংগং এর দিকে। দু’লেনের রাস্তা পাহাড় কেটে করা হয়েছে। কী অপূর্ব দৃশ্য! দেখে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই।
উলংগং আমাদের জেলার মতোই একটি শহর। কোথাও উচ্চ দালান কোথাও ছোট ছোট বাঙলো ঘর। মনে হচ্ছে, কোনো এক শিল্পী কাগজে ছবি এঁকেছে। কিছু দূরে আসার পর ছ’লেন সড়কে চলছি আমরা। এখানে ১০০ কিলোমিটার বেগে চলতে হবে, আমরা সেই ভাবেই যাচ্ছি। দুদিকে পাহাড় আর সবুজের চাদরে ঢাকা। মনে হচ্ছে আকাশ এখানে নেমে এসেছে। রোদ-মেঘের লুকোচুরি কাঁচা রোদের পশরা সাজিয়ে রেখেছে। স্বরীসৃপ পথ। এঁকেবেঁকে গেছে দক্ষিণে প্রশান্ত মহাসাগরের পাড়ে। আর মাত্র মিনিট দশকের পর পৌঁছালাম “সীক্লীফ” ব্রীজ। হাতের বামে মহাসাগর ডানে পাহাড়। নীল জলের ধার দিয়ে আমাদের গাড়ি যাচ্ছে। সাগরের কোল ঘেঁষে একবার উপরে আরেকবার নিচে এই ভাবে উলংগং এর দিকে ছুটছি ।
দীর্ঘ পথের দু’ধারে হাজারো রঙের বাহারি গাছ। সড়কের পাশে গড়ে উঠেছে শহর। ছিমছাম, সবকিছুই সাজানো গুছানো। রাস্তা ঘেঁষা শহরে সাগরের ঠাণ্ডা হাওয়া সব সময়ই যাওয়া আসা করে।
১.৩৫ মিনিটে পৌঁছে গেলাম কাঙ্খিত নর্থ উলংগং বীচে। সামনে মহাসাগর পিছনে বিশাল পাহাড়। দেখলে মনে হয় এক’শ তলার সমান। স্থানীয় এবং পর্যটকদের ভিড়ে মুখরিত হয়ে উঠেছে সমুদ্র সৈকত। গাঙচিলের ডাক অপূর্ব করে তুলেছে উলংগং এর সমুদ্র সৈকত। এখানে যেন নীলে মিশে আছে আকাশ-সমুদ্র। সাদা ফণার ধাক্কাটা দেখার মতো।
রোজা রেখে বেশিক্ষণ থাকা হলো না। এবার ফেরার পালা। তবুও পৃথুলের অনুরোধে দেখতে গেলাম উলংগং বিশ্ববিদ্যালয়। বিশাল ক্যাম্পাস। গাড়িতে করে যেতে হয় এক ক্যাম্পাস থেকে অন্য ক্যাম্পাস। গোটা ক্যাম্পাস ঘুরতে সময় লাগবে কয়েক ঘন্টা।
ঘড়িতে তখন বিকেল সোয়া চারটা। আমরা গাড়িতে বসে পড়লাম। এগুতে লাগলাম সামনে। পিছনে রেখে গেলাম সুনয়না প্রশান্ত মহাসাগরের ঢেউ। ঠাণ্ডা রোদ। পাহাড়ের অচেনা বৃক্ষ। বিদায় উলংগং।