শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬, ১২:০১ পূর্বাহ্ন

১৩ তারিখ থেকে বাংলাদেশে পরিবর্তনের সূচনা হবে: জামায়াত আমীর

  • আপডেট সময় : মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১৬২ বার দেখা হয়েছে

মো. রফিকুল হায়দার টিটু: জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আমরা সব ধর্ম দিয়ে দেশটাকে ফুলের বাগানের মতো সাজাবো। আমরা আমাদের প্রিয় জাতিকে আর ভাগ, টুকরা টুকরা করতে কাউকে সুযোগ দেবো না। অতীতের কাসুন্দি শেষ। ওগুলা জনগণ এখন শুনতে চায় না। ওগুলা শুনিয়ে শুনিয়ে জনগণকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে জনগণের কপাল-কিসমত যারা হাইজ্যাক করেছে, লুণ্ঠন করেছে, তাদের জায়গা বাংলাদেশে আর হবে না। ২৪ এর যুব সমাজ অতীতের পচা রাজনীতি অনুশীলন করার জন্য তারা বুক চিতিয়ে লড়াই করে নাই। তারা পরিবর্তন চেয়েছে, ১৩ তারিখ থেকে বাংলাদেশে সেই পরিবর্তনের সূচনা হবে, ইনশাআল্লাহ।

মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে জেলা জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় ডা. শফিকুর রহমান এসব কথা বলেন। কটিয়াদী সরকারি কলেজ মাঠে সকাল ৯টায় শুরু হওয়া জনসভায় বেলা সাড়ে ১১টার দিকে জামায়াত আমীর বক্তব্য রাখেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ছলে বলে কৌশলে যেকোনো ভাবে আমাকে জিততে হবে, এই ধারণা থেকে বের হয়ে আসেন। ওই পুরানা স্লোগান থেকে বের হয়ে আসেন। আমার ভোট আমি দেবো, তোমারটাও আমি দেবো- এই দিন শেষ। এই দিন আর ফিরে আসবে না। চব্বিশের যুবকেরা ঘুমিয়ে পড়েনি, জেগে আছে। তার ভোটের পাহারাদারি সে করবে, সাথে সাথে বাকি সকলের ভোটের পাহারাদারি করবে। কোনো দুর্বৃত্ত এখন আর কারো ভোটে হাত দিতে পারবে না।

আমরা প্রশাসনকে বলবো, আপনারা দক্ষতা এবং নিরপেক্ষতার সাথে, সততা এবং সাহসিকতার সাথে আপনারা নির্বাচনকে সামনে রেখে দায়িত্ব পালন করবেন। জাতি আপনাদের জন্য দোয়া করবে। ১৮ কোটি মানুষ আপনাদের পাশে থাকবে। আপনারা মেহেরবানি করে কারো কোনো ডাইন-বাম কথা শুনবেন না। আমরা কারো কাছে কোনো আনুকূল্য চাই না। কিন্তু আমাদের কোনো ক্ষতি করতে আসলে, আমরা কিন্তু ছেড়ে দিবো না। তিনি যেই হোন। আমার অধিকার আমাকে রক্ষা করতে হবে, এ লড়াই চলবে।

তিনি বলেন, আমার অধিকার মানে এই দেশে মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ১৮ কোটি মানুষের অধিকার। আমরা জামায়াতে ইসলামীর দলীয় সরকার কায়েম করতে চাই না। জামায়াতে ইসলামীর বিজয়ও আমি চাই না। আমি ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই। ১৮ কোটি মানুষের বিজয় হলে, সে বিজয় আমাদের সবার। দল-গোষ্ঠী-পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির কোনো বিজয় আমাদের কাছে নেই। বার্তা আমাদের অত্যন্ত পরিষ্কার। এই পথে পুরনো রাস্তায় যারা হাঁটতে চাইবেন অন্ধকার গলিতে, তাদের রাস্তায় তারা হাঁটুক। আমরা সদর রাস্তায় আলোকিত রাস্তায় হাঁটবো। আর জাতি এই আলোকিত রাস্তায়ই হাঁটবে।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জাতি কোনদিকে ইতোমধ্যে আলামত স্পষ্ট। যুব সমাজ সিদ্ধান্ত দিয়ে ফেলেছে, পাঁচ পাঁচটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনে বলে দিয়েছে, আমরা ন্যায়-ইনসাফের পক্ষে। আমরা আগামীর নতুন বাংলাদেশের পক্ষে। আমরা যুবকদের চব্বিশের আকাঙ্ক্ষার পক্ষে। এ রায় তারা দিয়ে দিয়েছে। মায়েরা-বোনেরাও তারা তাদের অপিনিয়ন ব্যক্ত করতে শুরু করেছেন। তারা বলেছেন, কেউ বলেন, আমরা ইসলামী দলের হাতে নিরাপদ, কেউ সোজাসাপটা বলেন, আমরা জামায়াতের হাতে নিরাপদ। এই অবস্থা দেখে এখন অনেকের একটু মাথা গরম হয়ে গেছে। মাঘ মাসে যদি মাথা এতো গরম হয়, চৈত্র মাসে কী হবে! একটু ঠাণ্ডা থাকুন। ধৈর্য ধরুন। ১২ তারিখ পর্যন্ত জনতার রায়কে সম্মান করুন।

জামায়াত আমীর বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনে যিনিই নির্বাচিত হয়ে আসুক, আমরা তাকে অভিনন্দন জানানোর জন্য প্রস্তুত। কিন্তু চোরাই পথে আর কোনো নির্বাচন হবে না। ইনশাআল্লাহ হতে দেওয়া হবে না। সমস্ত চোরাইগলি বন্ধ করে দেওয়া হবে। সেই পথেই আমরা এগিয়ে যাবো। আমরা চাচ্ছি, মানুষ একটু শান্তিতে-নিরাপদে থাকবে। কৃষক আধুনিক প্রযুক্তিতে তার জমিতে ফসল ফলাবে। একজন শ্রমিক তার ন্যায্য পাওনা পাবে এবং সে একটা মানবিক মর্যাদায় কাজ করবে। এই দেশে হাত পাতা মানুষ থাকবে না বরং হাত মজবুত হয়ে কাজ করা মানুষ থাকবে। যাদের কাজ করার মতো হাত থাকবে না, তাদের দায়িত্ব সরকার নিবে। আমরা বলেছি, একটা সুস্থ সবল জাতি গঠনের জন্য পাঁচ বৎসর পর্যন্ত শিশুদের সমস্ত দায়িত্ব হবে সরকারের। একটা শিশুও আর শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হবে না। সমস্ত শিশুকে শিক্ষা দিয়ে প্রশিক্ষিত করে দেশ গড়ার এক একজন কর্মী-কারিগর হিসেবে তৈরি করা হবে। তারা দেশে-বিদেশে যেখানেই সেবা দিবে, সেখানেই গৌরবের সাথে এবং দক্ষতার সাথে তারা সেবা দিবে। আমরা আর ওই খোঁড়া শিক্ষা ব্যবস্থা চাই না। আমরা এখন দক্ষতার যে শিক্ষাব্যবস্থা দিতে পারবে, আমাদের সন্তানদের হাতে সেটাই তুলে দেবো। তার সাথে দ্বীনি এবং নৈতিক শিক্ষা অবশ্যই থাকবে। মানুষ যদি মানবিক মূল্যবোধে গড়ে না ওঠে, সে দক্ষ হলেও সে দক্ষতার সাথেই দেশের বারোটা বাজাবে। আমরা ওই শিক্ষা চাচ্ছি না।

জামায়াত আমীর বলেন, জুলাই যোদ্ধারা যখন রাস্তায় নেমেছিলো, তখন যেমন আমাদের ছেলেরা যুদ্ধ করেছে, লড়াই করেছে, আমাদের মেয়েরাও লড়াই করেছে। এই দেশে আমাদের ছেলে-মেয়েদের, মা-বোনদের, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার কোনো নিরাপত্তা নেই। আগে তো আমার নিরাপত্তা তারপর আমার উন্নতি। দুটাই আমার দরকার, কোনোটাই আমাদের নাই। বিপুল সংখ্যক যুবক বেকার, তারা রাস্তায় নেমে বলে নাই- আমাদের বেকারভাতা দেন। তারা সেদিন বলেছিলো- উই ওয়ান্ট জাস্টিস, আমরা চাই আমাদের মেধার উপর সুবিচার করা হোক। কোনো মামু-খালুর লাল টেলিফোনে অথবা এন্ড্রয়েড মোবাইলের টেলিফোনে, কোনো রাজনৈতিক প্রভাবে আমার কপাল যেনো চোরাবালিতে হারিয়ে না যায়। আমার কপাল আমাকে দিতে হবে। আমার যোগ্যতা-মেধা অনুযায়ী আমার কাজ আমার হাতে তুলে দিতে হবে। এই দাবি নিয়ে তারা রাস্তায় নেমেছিলো। প্রিয় যুবকেরা কথা দিচ্ছি, ইনশাআল্লাহ। আমরা তোমাদেরকে শিক্ষা-প্রশিক্ষণ দিয়ে তোমাদের হাতকে বাংলা গড়ার কারিগরের হাতে পরিণত করবো। তোমাদের হাতে বেকারভাতা নয়, তোমাদের দাবি অনুযায়ী তোমাদের মর্যাদার সাথে সঙ্গতি রেখে সেই কাজগুলো তোমাদের হাতে তুলে দেবো। বাংলাদেশ তোমরাই গড়বা, তোমরাই চালাবা। সেদিন তোমরা গর্ব করে বলবা- আমিই বাংলাদেশ, আমরাই বাংলাদেশ, এটি আমার প্রিয় বাংলাদেশ। সেই দিনের অপেক্ষায় যুবকেরা আছে, এই দেশটাকে তোমাদের হাতে তুলে দিতে চাই। বাংলাদেশ নামক একটি উড়োজাহাজের ককপিটে-ড্রাইভিং সিটে আমরা তোমাদেরকে বসিয়ে দেবো। এই দেশকে নিয়ে তোমরা সামনের দিকে আগাবা। পিছনে ফিরে তাকানোর সময় আমাদের শেষ। এখন শুধু সামনে এগিয়ে যাওয়ার পালা। পিছন নিয়ে যারা কামড়া-কামড়ি করে তাদেরকে কামড়া-কামড়ি করতে দিবো আমরা। ওরা করুক। আমরা জাতিকে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাবো। তখন আমরা কোথায় থাকবো? তোমরা ককপিটে, আমরা থাকবো পেসেঞ্জার সিটে। এই দেশ এইভাবেই এগিয়ে যাবে।

নিজের ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার দাবি করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, মা-বোনেরা অপমানিত হলে আমি প্রতিবাদ করি। এ কারণে কিছু লোক আমার পেছনে লেগেছে। আমার এক্স আউডি হ্যাক করে নোংরা কথা ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

জামায়াত আমীর বলেন, আমাদের দেশ থেকে যে ২৮ লক্ষ কোটি টাকা চুরি করে বিদেশে পালিয়ে গেছে, ওদের পেটের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে সেই টাকা বের করে আনবো। ওই টাকাগুলা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হবে। এ দিয়ে ইনসাফভিত্তিক ৫৬ হাজার বর্গমাইলের উন্নয়ন করা হবে। যে এলাকাকে তার ন্যায্য পাওনা থেকে যত বেশি বঞ্চিত করা হয়েছে, উন্নয়ন সেই এলাকায় তত বেশি চলে যাবে।

কিশোরগঞ্জের উন্নয়ন প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের তিনভাগের একভাগ হাওর এলাকা। এই হাওর এলাকা আমাদের পেটের খাদ্যের যোগান দেয়। শুধু ডাল আর ভাত না। এই হাওর আমাদেরকে প্রোটিনও সরবরাহ করে। কিন্তু আজকে নদীগুলাকে খুন করা হয়েছে। আজকে জমাট বেঁধে হাওরগুলা, বিলগুলা ধ্বংস হয়ে গেছে। আমরা এগুলাতে হাত দিবো। নদীর জীবন ফিরে আসলে, বাংলাদেশের জীবন ফিরে আসবে। কাজেই নদী দিয়েই আমাদের উন্নয়নের সংস্কার শুরু হবে। এরপর আস্তে আস্তে ক্রমান্বয়ে সবদিকে নজর দেওয়া হবে।

বক্তৃতার সময় জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান কিশোরগঞ্জ জেলার ৬টি আসনের মধ্যে ৫টি আসনের ১১ দলীয় প্রার্থীদের হাতে প্রতীক তুলে দিয়ে পরিচয় করিয়ে দেন।

জেলা জামায়াতের আমীর ও কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের প্রার্থী অধ্যাপক মো. রমজান আলীর সভাপতিত্বে জনসভায় অন্যদের মধ্যে সাবেক সংসদ বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব) আখতারুজ্জামান রঞ্জন, কিশোরগঞ্জ-৩ আসনের জামায়াত প্রার্থী কর্নেল (অব) ডা. জেহাদ খান, কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের প্রার্থী এডভোকেট রোকন রেজা শেখ, কিশোরগঞ্জ-২ আসনের প্রার্থী শফিকুল ইসলাম মোড়ল, কিশোরগঞ্জ-৬ আসনের প্রার্থী মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন, এনসিপির কেন্দ্রীয় (উত্তরাঞ্চল) সংগঠক আহনাফ সাইদ খান, জেলা জামায়াতের সাবেক আমীর মাওলানা আব্দুস সালাম ও অধ্যক্ষ মাওলানা তৈয়বুজ্জামান, সাবেক নায়েবে আমীর অধ্যক্ষ মোছাদ্দেক ভূঁইয়া, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ, কিশোরগঞ্জ জেলা জামায়াতের সনাতনী শাখার সভাপতি কৃষ্ণ চন্দ্র বসাক, খেলাফত মজলিশের জেলা সভাপতি মাওলানা আব্দুল আহাদ প্রমুখ এবং বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
© All rights reserved © 2025 kishoreganjnews
Customized By Ayaz Host