বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ১১:৫০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
অলওয়েদার সড়কে পিকআপ-মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে স্বামী-স্ত্রী ও একমাত্র সন্তান নিহত কিশোরগঞ্জে জুলাই শহীদদের পরিবারে জামায়াতে ইসলামীর ঈদ উপহার অষ্টগ্রামে ভাঙনকবলিত গ্রাম ও সড়ক রক্ষায় এমপি ফজলুর রহমানের উদ্যোগে ড্রেজিং শুরু ধনু নদীতে পড়ে শিশু নিখোঁজ অষ্টগ্রামে বজ্রপাতে মারা গেলেন স্বামী, স্ত্রী-ও আহত রাশিয়ায় ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় করিমগঞ্জের যুবক নিহত, পরিবারে মাতম শিশু রামিসাসহ সকল ধর্ষণ ও হত্যার বিচারের দাবিতে কিশোরগঞ্জে বিক্ষোভ মিছিল প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতায় কিশোরগঞ্জ সদরে রবীন্দ্রসঙ্গীতে প্রথম হয়েছে সামিহা তাবাসসুম দুর্নীতি প্রতিরোধে করণীয় বিষয়ে কিশোরগঞ্জে দুদকের প্রশিক্ষণ কর্মশালা স্বাস্থ্যসেবায় নিরাপদ কর্মস্থল নিশ্চিত করার দাবিতে কিশোরগঞ্জে ড্যাবের মানববন্ধন

ঠোঁট লাল করা ‘লালডিঙি’ পান

  • আপডেট সময় : মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ, ২০২৬, ১২:২৫ অপরাহ্ণ

মো. আল আমিন: পান এক ধরনের লতাজাতীয় উদ্ভিদের পাতা। আদিকাল থেকে এই পান (পাতা) চিবানোর অভ্যাস বাঙালির। কারো কাছে এটি সখের বস্তু, কারো কাছে আসক্তির। দক্ষিণ এশিয়াসহ আমাদের দেশে মানুষ বিভিন্ন উপাচারে পানের সম্পর্ক ধরে রেখেছেন।

বাংলাদেশে ঐতিহ্যগতভাবে সামাজিক রীতি ও ভদ্রতার অংশ হিসেবে পানের ব্যবহার চলে আসছে। এক সময় বিয়ে-শাদি, ঈদ ও পূজা-পার্বণ পান ছাড়া চলতোই না। কনের বাড়িতে বরপক্ষ পান না নিয়ে এলে বিয়ে পর্যন্ত ভেঙে যেতো।

প্রাচীন অভিজাত সমাজে বিভিন্ন উপকরণে পান তৈরি হতো। তা সুন্দরভাবে পানদানিতে সাজানো ছিল এক ধরনের লোকজ শিল্প।

সেই সময়ের নানি-দাদিদের পান খাওয়ার শখ ছিল গল্পের মতো। শৌখিনতার সঙ্গে তারা পান খেতেন। ছিল পানের বাটা, সরতা।

যুগের পরিবর্তনে পানের বাটা ও সরতা সোনালি অতীতে ঠাঁই নিয়েছে। তবে বাঙালি সমাজে পানের সমাদর কমেনি। গ্রাম থেকে শহরের নানা অনুষ্ঠানে এখনো পান খাওয়ার রীতি চোখে পড়ে।

ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় গ্রামের অনেক নারী পান খান। নতুন বউ এলে নানি-দাদিরা শখ করে তাকে পান খাওয়া শেখান। এমন কথাও প্রচলিত আছে—পান খেয়ে ঠোঁট লাল করলে স্বামীর আদর বেশি মেলে!

গ্রামের মোড়ল প্রকৃতির লোকদের পান চিবাতে চিবাতে সালিশ-দরবার করার দৃশ্য এ দেশে বহুদিনের পরিচিত।

পুরান ঢাকার মানুষদের মুখভর্তি পান নিয়ে পিচকারি ফেলতে ফেলতে সাদা লুঙ্গির কোণা ধরে রাস্তায় হাঁটার দৃশ্যও সবার কাছে পরিচিত।

সময়ের পরিবর্তনে পান খাওয়ার ধরনেও এসেছে ভিন্নতা। এখন বাজারে বিভিন্ন উপকরণ মেশানো কুল্লি পাকানো পান পাওয়া যায়, যাকে বলা হয় ‘খিলি পান’। এটি বড় পান বা একাধিক পান ঠোঙার মতো করে পেঁচিয়ে বানানো হয়। এতে থাকে কুচি করে কাটা সুপারি, জর্দা, খয়ের, বিভিন্ন ধরনের মিষ্টিমসলা ও সুগন্ধি।

এসব পানের আবার বাহারি নামও রয়েছে- নবাবি পান, বাদশাহি পান, জমিদারি পান। ঢাকার বিশেষ করে পুরান ঢাকার বাসিন্দারা এসব পানের সমঝদার।

শুধু তাই নয়, রসিক সম্পর্কের নামেও রয়েছে নানা ধরনের পান- যেমন বেয়াই-বেয়াইন পান, শালি-দুলাভাই পান, ভালোবাসা পান, হাসিখুশি পান।

টঙ দোকান কিংবা গ্রামের মেলায় এসব পান বিক্রি করতে দেখা যায়। যারা নিয়মিত পান খান না, তারাও শখ করে এসব পান খান। অনেকেই বাড়িতে বউয়ের জন্য কিনে নিয়ে যান।

কিশোরগঞ্জের জেলখানা মোড়ে আবার এক ধরনের ‘আগুন পান’ বিক্রি হয়। কুল্লি পাকানো এই পানে নানা ধরনের মসলা থাকে। খাওয়ার আগে মসলায় আগুন ধরিয়ে খেতে হয়। পান খেতে খেতে আগুন একসময় নিভে যায়, চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সুগন্ধ। তবে এসব পান খাওয়ার ব্যাপারে চিকিৎসকদের সতর্কতাও রয়েছে।

এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জের বিশিষ্ট ওরাল অ্যান্ড ডেন্টাল সার্জন ডা. ফারুক আহমেদ বলেন, ‘রঙ-বেরঙের মসলা, সুপারি ও জর্দা দিয়ে পান না খাওয়াই ভালো। এতে মুখে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।’

খিলি পান হোক বা ঘরে বানানো পান- বড় আকারের পানের প্রতি বাঙালির আগ্রহ সব সময়ই বেশি। আর সেটি যদি দেখতে সুন্দর ও খেতে সুস্বাদু হয়, তাহলে তো কথাই নেই!

বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের পান উৎপাদন হয়। অঞ্চলভেদে এর মান ও বৈশিষ্ট্যেও পার্থক্য রয়েছে। চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও সিলেট অঞ্চলেও বেশ কিছু জনপ্রিয় জাতের পান রয়েছে। আজকের আলোচনা কিশোরগঞ্জের ‘লালডিঙি’ পান নিয়ে।

বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের মানুষের কাছে খুব পরিচিত ‘লালডিঙি’ পান। আকারে বড়, মসৃণ, সুগন্ধি, পুরু এবং সুস্বাদু। এই পানের চাষ কিশোরগঞ্জেই বেশি হয়।

কিশোরগঞ্জের মানুষ পান বলতে ‘লালডিঙি’কেই বোঝেন। প্রাকৃতিক সুগন্ধ, পুরু গঠন ও রসে ভরপুর হওয়ায় এটি তাদের কাছে বেশ সমাদৃত। এই পানের মিষ্টি স্বাদে প্রতিদিনই ঠোঁট রাঙান এ অঞ্চলের মানুষ।

বড় আকারের এবং খিলিপানের জন্য উপযোগী হওয়ায় ঢাকাসহ সারা দেশে এর বাজার তৈরি হচ্ছে। এমনকি আমেরিকা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবেও পৌঁছাচ্ছে কিশোরগঞ্জের ‘লালডিঙি’ পান।

কিশোরগঞ্জ শহরের পুরানথানা বাজারে ঢুকলেই গলির দুই পাশে চোখে পড়ে অসংখ্য পানের দোকান। এখানে পাইকারি ও খুচরা পান বিক্রি হয়।

বাজারের ব্যবসায়ী আবদুল মালেক জানান, বাপ-দাদার আমল থেকেই তাদের পানের ব্যবসা। বংশ পরম্পরায় তিনিও এ ব্যবসায় জড়িত। করিমগঞ্জ উপজেলার সুবন্দি, সাঁতারপুর ও জাঙ্গাল গ্রামে অসংখ্য পানের বরজ রয়েছে। সেখান থেকেই প্রতিদিন পান সংগ্রহ করে বাজারে আনেন তিনি।

তার ভাষ্য, ‘কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলায় লালডিঙি পানের চাষ সবচেয়ে বেশি। এছাড়া করিমগঞ্জ, হোসেনপুর, কটিয়াদী এবং ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলাতেও এ পানের চাষ হয়।’

সাধারণত ‘বিড়া’ হিসেবে (প্রতি বিড়ায় ১২০টি পান) এই পান বাজারে বিক্রি করা হয়। পুরানথানা বাজারের ব্যবসায়ীরা মিলে প্রতিদিন গড়ে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকার ‘লালডিঙি’ পান বিক্রি করেন।

বাজারের পান বিক্রেতা রাজা আলম (৩৮) জানান, প্রতিদিন তিনি ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার পান সংগ্রহ করেন। বাজারে মানভেদে প্রতি বিড়া লালডিঙি পান ২০০ থেকে ২৮০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।

আরেক বিক্রেতা ফিরোজ মিয়া (৫০) জানান, দেশের অন্যান্য পানের তুলনায় ‘লালডিঙি’ পানের আকার অনেক বড়। কোনো কোনো পান ১০ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হয়। পুরু ও সুগন্ধি হওয়ায় এই পানের জনপ্রিয়তাও অনেক।

পাকুন্দিয়া উপজেলা প্রতিনিধি মুহিব্বুল্লাহ বচ্চনের তথ্যমতে, উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে অনেকে এই পান চাষ করে লাভবান হচ্ছেন। দিন দিন বাড়ছে এর আবাদও। গ্রামে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন বরজ। কৃষকেরা সপ্তাহে দুইদিন বাজারে পান বিক্রি করে সংসারের খরচ চালান। উপজেলার বরাটিয়া, সৈয়দগাঁও, চালিয়াগোপ, হোসেন্দী, হিজলিয়া, দরদরা ও বাহাদিয়া গ্রামে এ বছর ব্যাপক আকারে পানের আবাদ হয়েছে।

এ এলাকার কৃষকরা মূলত দেশি জাতের দুটি পান চাষ করেন—’লালডিঙি’ ও ‘ঘয়াসুর’। সুস্বাদু হওয়ায় লালডিঙির আবাদই বেশি। গরমের সময় লালডিঙি পান বিশেষ সুস্বাদু হয়, তাই কৃষকেরাও বছরের বেশিরভাগ সময় এই জাতের পান চাষ করেন।

বর্তমানে বড় আকারের লালডিঙি পান প্রতি ২০ বিড়া (২৪০০ পান) ৫০০০ থেকে ৫,৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে এর দাম ৬০০০ থেকে ৬,৫০০ টাকায় পৌঁছায়।

বাংলা মাসের ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক ও অগ্রহায়ণ এই চার মাস পানের মৌসুম। এ সময় গাছে প্রচুর পান ধরে, তাই বাজারে দামও অপেক্ষাকৃত কম থাকে। ফাল্গুন ও চৈত্রে ফলন কমে যাওয়ায় দাম বাড়ে। বর্তমানে পানের দাম বেশি।

হিজলিয়া গ্রামের কৃষক আবদুল আউয়াল জানান, তিনি তিন কাঠা জমিতে লালডিঙি পান চাষ করেছেন। এতে তার খরচ হয়েছে প্রায় দেড় লাখ টাকা। বর্তমানে প্রতি সপ্তাহে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকার পান বিক্রি করছেন তিনি।

চালিয়াগোপ গ্রামের কৃষক হাদিউল ইসলাম চার কাঠা জমিতে লালডিঙি পান চাষ করেছেন। ফাল্গুনে বরজে ফলন কম হয়েছে। তবুও বর্তমান বাজারদরে বিক্রি করে ভালো লাভের আশা করছেন।

জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মো. সাদিকুর রহমান বলেন, “লালডিঙি পান শুধু গ্রামের কৃষকের আয় বাড়াচ্ছে না, এই পান কিশোরগঞ্জকেও পরিচিত করছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় পানের বরজে কৃষকের পরিশ্রমে তৈরি হচ্ছে লালডিঙির সুগন্ধি ইতিহাস।’ তিনি বলছিলেন- ‘এখন এই সুগন্ধ শুধু দেশে নয়, বিদেশি ক্রেতাদের নাকে গিয়েও লাগছে।’

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
© All rights reserved © 2025 kishoreganjnews
Customized By Ayaz Host